মো. নাজমুল ইসলাম চৌধুরী
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ১৯৯ বার পঠিত
বাংলাদেশের কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, কাটারিভোগ, বাদশাভোগ, BRRI Dhan-34সহ বিভিন্ন সুগন্ধি চাল দেশের ঐতিহ্যবাহী ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য। বর্তমানে আন্তর্জাতিক চাহিদা বৃদ্ধি, রপ্তানি অনুমোদন, উৎপাদন-সরবরাহের ঘাটতি, প্যাকেটজাতকরণ এবং সম্ভাব্য মজুতদারির কারণে দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাই ২০২৬-এর বাজার প্রতিবেদনে গত ছয় মাসে সুগন্ধি চালের দাম প্রায় ৫৭% বেড়ে খুচরা পর্যায়ে প্রায় ২১৫–২২০ টাকা/কেজিতে পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রপ্তানির বর্তমান চিত্র
সরকার ২০২৬ সালে পর্যায়ক্রমে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। মে ২০২৬-এ ২১১টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৩৬,৪০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
পরবর্তীতে জুলাই ২০২৬-এ আরও ৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে ৮,৮০০ টন রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। এ পর্যায়ে সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম FOB রপ্তানি মূল্য ১.৮০ মার্কিন ডলার/কেজি।
অর্থাৎ ন্যূনতম দরে হিসাব করলে এ বিষয়ে আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় :-
১ কেজি সুগন্ধি চাল $1.80
৫০ কেজির বস্তা $90
১ টন (১,০০০ কেজি) $1,800
৮,৮০০ টন $15.84 মিলিয়ন
৩৬,৪০০ টন $65.52 মিলিয়ন
*৩৬,৪০০ টনের ক্ষেত্রে প্রতিটি অনুমোদনের সুনির্দিষ্ট FOB মূল্য এক নয়/প্রকাশিত তথ্য অসম্পূর্ণ; তাই $1.80/কেজি ধরে এটি শুধু তাত্ত্বিক ন্যূনতম হিসাব।
২০২৫ সালে রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য ছিল :- $1.60/কেজি, অর্থাৎ ৫০ কেজিতে $80।
কোন কোন দেশে রপ্তানি হচ্ছে
বাংলাদেশের সুগন্ধি চাল প্রধানত প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর বাজারকে কেন্দ্র করে রপ্তানি হয়। সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক চালান-তথ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, জাপান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড ও মরিশাস-এ বাংলাদেশি সুগন্ধি চালের চালান দেখা যায়।
USDA-ও জানিয়েছে, বাংলাদেশ সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রবাসী বাংলাদেশি-অধ্যুষিত বাজারে সুগন্ধি চাল রপ্তানি করে। তাদের ২০২৫/২৬ সালের পূর্বাভাসে মোট চাল রপ্তানি প্রায় ৫,০০০ টন ধরা হয়েছিল—এটি অবশ্য সব ধরনের চালের রপ্তানি, শুধু সুগন্ধি চালের নয়।
৩. দেশের উৎপাদন ও চাহিদা
সুগন্ধি চালের উৎপাদন নিয়ে বিভিন্ন উৎসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বছরে প্রায় ১৮–২০ লাখ টন উৎপাদনের দাবি করা হলেও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী FY2023-24-এ সুগন্ধি চালের উৎপাদন ছিল প্রায় ১০.২৩ লাখ টন। ফলে বর্তমান প্রকৃত উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উদ্বৃত্তের বিষয়ে একটি সরকারি সমন্বিত জরিপ জরুরি।
বাংলাদেশের মোট চালের চাহিদা অবশ্য অনেক বেশি—USDA ২০২৫/২৬ অর্থবছরে মোট চালের ভোগ প্রায় ৩৮ মিলিয়ন টন অনুমান করেছে। কিন্তু এর মধ্যে সুগন্ধি চালের নির্দিষ্ট জাতীয় চাহিদার হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যান সহজলভ্য নয়।
মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণ
সুগন্ধি চালের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ—
ক. আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দাম ও রপ্তানি চাহিদা
খ. দেশীয় উৎপাদন ও বাজার সরবরাহের ঘাটতি
গ. বড় মিলার/ব্যবসায়ীদের মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ
ঘ. প্যাকেটজাত চালের অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন
ঙ. পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং ব্যয়
চ. বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর একাধিক স্তর
ছ. ভেজাল/কৃত্রিম সুগন্ধি মেশানো নিম্নমানের চালের অভিযোগ।
২০২৬ সালের বাজার প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের একাংশ রপ্তানি অনুমোদন ও মজুতদারিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন; অন্যদিকে মিলাররা আন্তর্জাতিক চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন।
নকল ও নিম্নমানের সুগন্ধি চাল
বাজারে নিম্নমানের চালের সঙ্গে ফ্লেভার/সুগন্ধি মিশিয়ে প্রকৃত সুগন্ধি চাল হিসেবে বিক্রির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। এ ধরনের প্রতারণা শুধু ভোক্তার আর্থিক ক্ষতিই করে না; প্রকৃত কৃষক ও মানসম্পন্ন চাল উৎপাদনকারীদের বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাই BSTI, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে আকস্মিক বাজার অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন।
সরকারের করণীয়
১. সুগন্ধি চাল রপ্তানির আগে দেশীয় চাহিদা ও বাজার সরবরাহের বাধ্যতামূলক মূল্যায়ন করা।
২. প্রয়োজন অনুযায়ী রপ্তানির কোটা কমানো, সাময়িক স্থগিত বা পুনর্নির্ধারণ করা।
৩. খাতুনগঞ্জ, পুরান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও উত্তরবঙ্গের বড় চাতাল-মিলগুলোতে মজুত, উৎপাদন ও বিক্রির তথ্য ডিজিটাল মনিটরিং করা।
৪. বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কোটা, বাস্তব উৎপাদন, মজুত ও রপ্তানি চালানের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা।
৫. নকল/ভেজাল সুগন্ধি চাল জব্দ ও দায়ী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
৬. প্যাকেটজাত চালের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী, জাত, উৎপাদনের তারিখ, মান ও উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা।
৭. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত খুচরা ও পাইকারি মূল্য মনিটরিং করা।
৮. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তার স্বার্থে প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট জাতের সুগন্ধি চালের জন্য সহনীয় মূল্যসীমা/বাজার নির্দেশিকা নির্ধারণ করা।
৯. কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং একই সঙ্গে ভোক্তাও সহনীয় দামে চাল কিনতে পারেন—এমন উৎপাদক-ভোক্তা ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা।
উপসংহার
সুগন্ধি চাল বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিপণ্য এবং এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু রপ্তানি আয় বৃদ্ধির স্বার্থে দেশের সাধারণ ভোক্তাকে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে এই চাল কিনতে বাধ্য করা অর্থনৈতিকভাবে কাম্য নয়। বিশেষ করে বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক উৎসবে বহুল ব্যবহৃত পোলাওর চাল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও পড়ে।
অতএব ‘রপ্তানি বাড়বে, কিন্তু দেশের বাজারে সংকট তৈরি হবে না’—এই নীতিকে ভিত্তি করে সুগন্ধি চালের উৎপাদন, মজুত, পাইকারি-খুচরা বিক্রি, রপ্তানি ও মূল্য—সম্পূর্ণ সরবরাহব্যবস্থাকে সরকারের কঠোর ও নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে নকল ও নিম্নমানের সুগন্ধি চালের বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি ।
লেখক ও পরিচালক, সিসিআরএসবিডি (চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিউনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ)
Posted ০৫:০৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন